বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:৫২ অপরাহ্ন
পরিবর্তন সংবাদদাতাঃ
বিচারের বাণী আজ নিভৃতে কাঁদছে। ভারতের বিহারের মধুবনী জেলায় এক পৈশাচিক ও বর্বরোচিত ঘটনার প্রধান অভিযুক্ত মাগনু সিং জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। রোজা রাখা অবস্থায় রোশন খাতুন নামের এক অসহায় মুসলিম নারীকে খুঁটিতে বেঁধে পিটিয়ে হত্যা এবং তৃষ্ণার্ত অবস্থায় তাকে প্রস্রাব ও মদের মিশ্রণ খাইয়ে দেওয়ার মতো জঘন্য অপরাধে অভিযুক্ত এই ব্যক্তি জেল থেকে বের হওয়ার পর যে দৃশ্য দেখা গেছে, তা সভ্য সমাজকে স্তম্ভিত করে দিয়েছে।
কারাগার থেকে বের হওয়ার পর মাগনু সিংকে রাজকীয় সংবর্ধনা দিয়েছে তার সমর্থকরা। গলায় ফুলের মালা পরিয়ে, আতশবাজি ফুটিয়ে এবং আকাশবাতাস কাঁপানো স্লোগানে খুনের আসামিকে বরণ করে নেওয়া হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সেই উল্লাসের ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে ভুক্তভোগী পরিবার ও সচেতন মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। স্বজনদের অভিযোগ, একজন খুনিকে এভাবে বীরের বেশে বরণ করে নেওয়া নিহতের ক্ষতে লবণের ছিটা দেওয়ার শামিল।
আদালতের এই জামিন আদেশের পর রোশন খাতুনের পরিবার মুষড়ে পড়েছে। বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থা হারিয়ে নিহতের ভগ্নিপতি শামসের মনসুরি ‘দ্য অবজারভার পোস্ট’-কে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘‘আমরা কোনো আশাই আর দেখতে পাচ্ছি না। যে মামলার নথিতে স্পষ্ট অপরাধের প্রমাণ রয়েছে, সেখানে ম্যাজিস্ট্রেট কীভাবে জামিন দিলেন? আমরা শুনেছি আদালতে সবকিছু আগে থেকেই ঠিক করা ছিল। এই যদি হয় আইনের অবস্থা, তবে গরিব ও সংখ্যালঘুদের বিচার পাওয়ার আর কোনো জায়গা নেই।’’স্বজনদের আহাজারিতে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। তারা প্রশ্ন তুলেছেন, প্রকাশ্যে একজন নারীকে পিটিয়ে মারার পরও যদি মূল আসামি এভাবে মুক্ত হয়ে উৎসবে মাতোয়ারা হতে পারে, তবে দেশে আইনের শাসন কোথায়?“আদালতে কী হলো আমরা কিছুই বুঝতে পারলাম না। হুট করেই শুনলাম ম্যাজিস্ট্রেট তাকে জামিন দিয়ে দিয়েছেন। যার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে, তাকে কিসের ভিত্তিতে জামিন দেওয়া হলো? আমরা শুনছি আদালতে নাকি সব আগে থেকেই ‘ফিক্স’ করা ছিল। যদি এভাবেই বিচার হয়, তবে আমাদের মতো সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে?”ঘটনার সূত্রপাত গত ২৫ ফেব্রুয়ারি। আমহি গ্রামের বাসিন্দা রোশন খাতুন একটি স্থানীয় বিরোধ মেটাতে গ্রামপ্রধানের বাড়িতে গিয়েছিলেন। সেখানে মুখিয়ার ছেলে মাগনু সিং ও তার দলবল তাকে আটক করে অকথ্য নির্যাতন চালায়।প্রত্যক্ষদর্শী ও পরিবারের দাবি অনুযায়ী, দিনটি ছিল অত্যন্ত পবিত্র। রোশন খাতুন তখন রোজা রেখেছিলেন। নির্যাতনের একপর্যায়ে তিনি যখন তৃষ্ণায় কাতর হয়ে জীবন ভিক্ষা চাইছিলেন এবং এক ফোঁটা পানি চেয়েছিলেন, তখন তাকে পানি দেওয়ার বদলে চরম ধর্মীয় অবমাননা করা হয়। অভিযোগ উঠেছে, নরপিশাচরা তাকে পানি না দিয়ে জোরপূর্বক মদ্য ও প্রস্রাবের মিশ্রণ পান করতে বাধ্য করে। এই অমানবিক ও পৈশাচিক নির্যাতনের চারদিন পর, ১ মার্চ পাটনা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই নারী।
এই মামলায় ১৯ জন নামধারী আসামি থাকলেও পুলিশ রহস্যজনকভাবে কেবল মাগনু সিংকে গ্রেপ্তার করেছিল। বাকি আসামিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও তাদের ধরার কোনো তাগিদ দেখায়নি প্রশাসন। উল্টো নিহতের পরিবার অভিযোগ করেছে যে, শুরু থেকেই পুলিশ মামলাটি হালকা করার চেষ্টা করেছে এবং সঠিক সময়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে বাধা দিয়েছে। রোশন খাতুন হত্যা মামলার প্রধান অভিযুক্তের এই জামিন এবং জামিন-পরবর্তী ‘বিজয় মিছিল’ বিহারের বিচারিক পরিবেশকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। জেল থেকে বের হওয়ার পর মাগনু সিং ও তার সমর্থকদের আচরণ নিহতের পরিবারের যন্ত্রণাকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। স্থানীয় মানবাধিকার কর্মীদের মতে, এ ধরনের ঘটনা অপরাধীদের আরও উৎসাহিত করবে এবং সমাজে সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ছড়িয়ে দেবে।রোশন খাতুনের পরিবার এখন কেবল মহান আল্লাহর কাছেই বিচার চেয়ে আর্তনাদ করছে। তাদের একটাই দাবি, উচ্চতর আদালত যেন এই অন্যায় জামিন বাতিল করে অপরাধীদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনে।
All rights reserved © 2020-2024 dainikparibarton.com
অনুমতি ব্যতিত এই সাইটের কোনো কিছু কপি করা কপিরাইট আইনে দণ্ডনীয়।